October 25, 2021, 2:16 am

চা শ্রমিকদের রক্তে রঞ্জিত ২০ মে-এর শতবর্ষ আজ

চা বাংলাদেশ তথা বিশ্বের প্রায় সকল দেশের জনপ্রিয় প্রধান পানীয়। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যানে চায়ের চাষ দিন দিন যত বাড়ছে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় পানীয় হিসাবে চায়ের কদর তত বাড়ছে। এই চায়ের উৎপাদন ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে চা-শ্রমিকদের আত্মত্যাগের অনেক ইতিহাস। এমনি একটি ইতিহাস হল ১৯২১ সালের ২০মে। যে দিনটি আজ চা শ্রমিক দিবস হিসাবে প্রতিষ্ঠিত। আজ চা-শ্রমিকদের রক্তে রঞ্জিত ২০ মে’র শতবর্ষ।

কালের আবর্তে এই দিনটি হারিয়ে গিয়েছিল, আবার ২০০৮ সাল থেকে বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ফেডারেশন দিনটি বাগানে বাগানে অস্থায়ী শহিদমিনার নির্মাণের মাধ্যমে পালন করতে শুরু করে। এখন পাড়িবাগানসহ পঞ্চায়েত কমিটি আছে এরকম ২৪১টি বাগানের প্রায় সব বাগানে বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ফেডারশন, চা শ্রমিক ইউনিয়নসহ বিভিন্ন চা-শ্রমিক সংগঠন অধিকার আদায়ের দিন হিসাবে দিবসটি পালন করে।

২০ শে মে হল চা শ্রমিকদের শোষণ, প্রতারণা, নির্যাতন, নিপীড়ন আর অধিকারহীন দাসসম জীবনযাপনের নির্মমতা থেকে মুক্তির লড়াইয়ের এক গৌরবময় রক্তস্নাত সংগ্রামের ইতিহাস। একটি সংগ্রামী ঐতিহ্য চেতনার দিন ২০শে মে। ১৯২১ সালে এই দিনে চাঁদপুর মেঘনা নদীর স্টিমার ঘাটে মালিকদের মদদে বৃটিশ গোর্খা সৈন্যদের নির্বিচার গুলিবর্ষণে শত শত চা-শ্রমিকদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল মেঘনার জল।

২০শে মে’র প্রেক্ষাপট :

উনবিংশ শতাব্দির প্রথম ভাগে ভারতে চা- শিল্পের সূচনা। ১৯৫১ সাল থেকে চা উৎপাদন শুরু হয়। বাংলাদেশের সিলেটে ১৮৫৪ সালে মালনীছড়া চা- বাগান প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদন শুরু হয়। চা-শিল্প লাভজনক হওয়ার ফলে বৃটিশ কোম্পানি একের পর এক বাগান প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করলে প্রচুর পরিমান চা-শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। তখন দক্ষিণ ও মধ্য ভারতের অনুর্বর অবহেলিত উড়িষ্যা, মাদ্রাজ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, আসাম, মিজুরাম প্রভৃতি এলাকার অভাবপীড়িত হাজার হাজার বেকার কৃষক-মজুরদের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে দালালদের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থান থেকে পুরুষ নারী ও শিশুদের জোরপূর্বক নিয়ে আসা হয়। এসকল মানুষদের আসাম ও সিলেট অঞ্চলের গহীন জঙ্গলে নামমাত্র মজুরীতে অমানুষিক পরিশ্রম করতে বাধ্য করে। সারা দিনের খাটুনিতে তারা ঠিকমত খাবার জুটাতে পারত না। অখ্যাদ্য অসুখ-বিসুখ মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া, বিষাক্ত সাপের কামড়, হিংস্র জন্তু জানোয়ারদের আক্রমণ এবং একি সাথে মালিকদের নির্মম নির্যাতন চলত রাষ্ট্রীয় আইনে এমনি একটি আইন “ওয়ার্ক ম্যানন্স ব্রিচ অব কন্ট্রাক্ট এক্ট” যে আইনে বলা হয়েছিল যদি শ্রমিকরা চুক্তিভঙ্গ করে বাগান থেকে চলে যেতে চায়, তা হবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আর বাগান মালিকদের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল তাদের গ্রেফতার করার।

এরকম অসংখ্য জঘন্য কাল আইনের বেড়াজালে শ্রমিকদের জীবন প্রায় দাসত্বের জীবনের পরিণত হয়েছিল। চা-শ্রমিকদের বেঁচে থাকার কোন পথ খোলা ছিল না। অসহায় এই শ্রমিকদের আর্তনাদে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল অথচ এই শ্রমিকদের বলা হয়েছিল ‘গাছ হিলায়ে তো পয়সা মিলেগা’ এখানে টাকার গাছ আছে গাছে ঝাঁকি দিলে টাকা মিলবে সেই গাছের টাকায় তাদের দুঃখ ঘুছে যাবে। গাছ থেকে টাকা আসতো ঠিকই, তা পুরোটাই চলে যেত মালিকের পকেটে আর চা-শ্রমিকদের জন্য বরাদ্ধ ছিল অকথ্য নির্যাতন শোষণের দুর্বিষহ জীবন। তাই তারা পরস্পরের সাথে যোগাযোগ করে ‘নিজ মূল্লুকে’ যাওয়ার বাসনা নিয়ে দিনক্ষণ ঠিক করে রওয়ানা দিল নিজ মাতৃভূমির উদ্দেশ্যে।

প্রায় ৩০ হাজার চা-শ্রমিক রেললাইন ধরে দিনের পর দিন হাঁটতে হাঁটতে চাঁদপুর মেঘনা নদীর তীরে গিয়ে জমা হল। শ্রমিকরা জানত শুধু চাঁদপুর থেকে স্টিমারে করে কলকাতা যাওয়া যায়। পথে খাদ্য এবং পানির অভাবে অনেক শ্রমিক মারা গেল, পথে পথে গ্রামের মানুষজন সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের সাহায্য করেছিল। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন পন্ডিত দেওশরন এবং পন্ডিত গঙ্গা দয়াল দীক্ষিত। অন্যদিকে বাগান মালিকরা সরকারের সহযোগিতায় চা শ্রমিকদের প্রতিরোধ করতে চাঁদপুর মেঘনা ঘাটে আসাম রাইফেলস এর গোর্খা সৈন্য মোতায়েন করে। শ্রমিকরা যখন স্টিমারে উঠতে গেল তখন গোর্খা সৈন্যরা বাধা দিল এবং তাদের বিদ্রোহ দমনের জন্য নির্বিচারে গুলি শুরু করল। এতে শত শত চা শ্রমিক মারা গেল এবং শ্রমিকদের রক্তে মেঘনার নদীর জল লাল হয়ে গিয়েছিল। ইতিহাসে যুক্ত হল মালিক শ্রেণি কর্তৃক শ্রমজীবী মানুষকে পৈশাচিকভাবে হত্যার একটি ঘৃণ্যতম লোমহর্ষক ঘটনা।

এ যেন ১লা মে ১৮৮৬ সালের আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটের ঘটনাকেও হার মানাল। এই দিনটি আজও চা-শ্রমিকদের কাছে শ্রদ্ধা ভালবাসা আর সংগ্রামের চেতনায় চির ভাস্বর হয়ে আছে। শ্রমিকদের এই বিদ্রোহ দমন করতে সরকারের পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কমিশনার কিরণ চন্দ্র দেব, ম্যাজিস্ট্রেট সুশীল সিং এবং মালিকদের প্রতিনিধি ফার্গুসন। ধারাবাহিকভাবে বৃটিশ শাসন, পাকিস্তানি শাসন ও মুক্তিযুদ্ধের পর চা-শ্রমিকদের জীবনে আজও ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি।

তাই ২০শে মে’র লড়াইয়ের চেতনা নিয়ে চা-শ্রমিকরা ‘চা-শ্রমিক দিবস’র রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, ভূমির স্থায়ী মলিকানা, প্রতিটি বাগানে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও হাসপাতাল নির্মাণ করা এবং দৈনিক মজুরী ৫০০ টাকা করাসহ বিভিন্ন দাবিতে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন করে যাচ্ছে।

চা শ্রমিকদের রক্তে রঞ্জিত ২০ মে’র শতবর্ষে শ্রদ্ধা জানাই অধিকার আদায়ের লড়াকু শহিদ চা শ্রমিকদের।

লেখক : প্রণব জ্যোতি পাল। উপদেষ্টা, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ফেডারেশন, কেন্দ্রীয় কমিটি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


লাইক দিন
%d bloggers like this: