October 23, 2021, 12:15 pm

এবার এসআই মামুনুর রশীদকে রক্ষায় আহাদের দৌড়ঝাপ, অবৈধ সম্পদে কোটিপতি মামুন

নদী টিভি ডেস্ক:

এবার গোলাপগঞ্জ থানার তাৎক্ষনিক প্রত্যাহারকৃত এসআই মামুনকে রক্ষায় তৎপর হয়ে উঠেছেন দালাল উপাধিতে ভূষিত আব্দুল আহাদ উরফে নূর মিয়া। গোলাপগঞ্জ থানা থেকে গত ১০ মে এসআই মামুনকে বিভিন্ন অভিযোগে প্রত্যাহার করা হলেও নানা বিষয়ে কালক্ষেপন করে প্রতিদিনই থানায় যাতায়াত রয়েছে তার। তার শাস্তি প্রত্যাহারের জন্য গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার সংসদীয় আসনে আস্থাভাজন নেতাকে দিয়ে দালাল নামে পরিচিতি নুর মিয়া ওরফে আহাদ প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন বলে জানা যায়। গোলাপগঞ্জ থানায় পিএসআই হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা মামুন এই থানাতেই এসআই হিসেবে পদোন্নতি পান। তিনি এসআই হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার পেছনে আস্থাভাজন নেতাকে দিয়ে আহাদের হাত রয়েছে বলে জানা গেছে। মামুন গোলাপগঞ্জ থানায় থেকেই কোটিপতি হয়েছে।

সিলেটের গোলাপগঞ্জ মডেল থানা যেন টাকার খনি। সিলেট-জকিগঞ্জ রোডের একমাত্র চেকপোস্ট গোলাপগঞ্জ থানা এলাকায়। বছরে কোটি টাকার চোরাচালান জকিগঞ্জ সীমান্ত হয়ে গোলাপগঞ্জ হয়ে সিলেট নগরীতে প্রবেশ করে। এ রুটের সকল চোরাচালান মূলত নিয়ন্ত্রণ হয় গোলাপগঞ্জ এলাকা থেকে। আর এই থানায় পোস্টিং পাওয়া অফিসাররা কোটিপতি হতে খুব একটা সময় যায় না।

পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাগ্য খুলে এ থানায় পোস্টিং হলে। কোনো কারণে থানা থেকে বদলী বা প্রত্যাহার হলেও ছেড়ে যেতে গড়িমসি করেন দায়িত্বশীলরা। মামলার তদন্ত ও কাগজপত্র জমা দেওয়ার নামে সময়ক্ষেপন চলে সমানে। সর্বশেষ স্ট্যান্ডরিলিজ হওয়ার পরও থানার মায়া ছাড়তে পারেন নি কোটিপতি এসআই মামুনুর রশীদ।

গত ১০ মে প্রশাসনিক কারণে এসআই মামুনুর রশীদকে তাৎক্ষনিক স্ট্যান্ড রিলিজ করার ম্যাসেজ যায় থানায়। ম্যাসেজ পাওয়ার সাথে সাথে থানা থেকে বের হলেও মামলার কাগজপত্র ও নথি আটকে রেখে প্রতিদিনই থানায় যাতায়াত রয়েছে তার।

শুধু থানায় যাতায়াতই নয়, প্রভাবশালী এসআই মামুনুর রশীদ থানায় কর্মরত সিনিয়র অফিসারদের অমান্য করে থানার চেইন অব কমান্ড লঙ্ঘন করলেও তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করেন নি থানার দায়িত্বশীলরা। গত ১৭ মে রাতে বহিরাগত হয়েও থানার ডিউটি অফিসারের রুমে ওসি (অপারেশন) এর সামনে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার হওয়া সাংবাদিক সেলিম হাসান কাওছারকে নির্যাতন করলেও থানার কোনো কর্মকর্তা এর প্রতিবাদ করেন নি। এ সময় অদূরেই উপস্থিত ছিলেন এসআই মামুনের ঘনিষ্টজন সাংবাদিক নামধারী আবদুল আহাদ ওরফে নুর মিয়া।

এদিকে, গোলাপগঞ্জ থানায় পিএসআই হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন মামুনুর রশীদ। কর্মজীবনের শুরুতেই জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় বেপরোয়া হয়ে ওঠেন মামুনুর রশীদ। দ্রুততম সময়ে শিক্ষানবিশ কাল থেকে করে এসআই হিসেবে একই থানায় দায়িত্ব পালন শুরু করেন।

এ সময় থেকেই তার যাতায়াত বাড়তে থাকে আবদুল আহাদের অফিসে। সেখানে বসেই নানা কৌশল নিয়ে ভূক্তভোগীদের হয়রানি শুরু করেন তিনি। আহাদের দেওয়া পরিকল্পনায় মামলার বাদি-বিবাদির কাছ থেকে দুহাতে টাকা কামাতে শুরু করেন।

উপজেলার বিভিন্ন স্থানে চোরাচালানীদের মদদ, জামায়াত শিবির কর্মীদের গ্রেফতার এড়াতে সহযোগিতা করাসহ টিলাকাটা, নদীর তীর দখল, মাদক ও জুয়ার আড্ডা থেকে তুলতে শুরু করেন মাসোহারা। এছাড়া তার কাছে তদন্তে থাকা মামলাগুলোর বাদি-বিবাদিকে দফায় দফায় ডেকে এসে জিজ্ঞাসাবাদের নামে ভয়ভীতি প্রদর্শণ করে বড় অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার মিশন শুরু করেন তিনি।

এসআই মামুনুর রশীদের এই অবৈধ লেনদেন হতো মূলত আবদুল আহাদ ওরফে নুর মিয়ার মাধ্যমে। ফলে যোগদানের আড়াই বছরের মাথায় সিলেট নগরীর আখালিয়াঘাট মসজিদের পাশে কোটি টাকা খরচ করে বহুতলা ভবনের কাজে হাত দেন। এছাড়া তার গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর এলাকায় রয়েছে নামে বেনামে বিপুল সম্পত্তি।
এদিকে এসআই মামুনুর রশীদের মামলা তদন্তে অনিয়ম ও বাদির স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগে বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। বাদির স্বাক্ষর জালিয়াতি করে ও প্রকৃত স্বাক্ষীদের পাশ কাটিয়ে মনগড়া স্বাক্ষ্য তৈরি করে মামলার চুড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের ঘটনায় পুলিশ সদর দফতরের নির্দেশে তদন্তে নেমেছে পিবিআই, সিলেট।

তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ খালেদ উজ জামান। গোলাপগঞ্জের রণকেলী উত্তর গ্রামের মৃত আওলাদ হোসেনের ছেলে সেলিম হাসান কাওছার গত ১৭ ফেব্রুয়ারি পুলিশ সদর দফতরের আইজিপি কমপ্লেইন সেলে গোলাপগঞ্জ মডেল থানার এসআই মামুনুর রশীদের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ করেন।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ২০২০ সালের ৩ মার্চ ও ৭ জুলাই কাওছার নিজে বাদি হয়ে গোলাপগঞ্জ থানায় শরিফগঞ্জ ইউনিয়নের বসন্তপুর মানিককোনা গ্রামের তাজ উদ্দিনের ছেলে পারভেজ আহমদ (২২) ও পানিআগা গ্রামের ওমর আলী ওরফে আজিজুর রহমানের ছেলে মিজানুর রহমান ইমনের (২৮) বিরুদ্ধে প্রতারণামূলক চুরি ও হত্যার উদ্দেশ্যে হামলার অভিযোগ এনে এজাহার দিলে এসআই খান জালালকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু তিনি কোন ব্যবস্থা নেননি। ফলে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হন।

২০২০ সালের ১৪ জুলাই তিনি সিলেটের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা (নং ১৭০) করলে আদালত গোলপগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন।

এ পর্যায়ে মামলার তদন্তের দায়িত্ব পান এসআই মামুনুর রশীদ। তদন্তকালে তিনি অভিযুক্ত পারভেজের কাছ থেকে চুরি করা স্মার্টফোন, সিমকার্ড, মেমোরি, পেনড্রাইভ উদ্ধার ও জব্দ করেন। তখন এসআই মামুনুর রশীদ নানা বাহানায় অভিযোগকারী কাওসারের কাছ থেকে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা উৎকোচ নেন। এরপর মামুন আসামিদের থানায় নিলেও গ্রেফতার না করেই ছেড়ে দেন এবং কাওছারের কাছে আপোসের প্রস্তাব দিতে থাকেন। তা না মানলে অভিযুক্তরাও মামলা করবে বলে হুমকি দিতে থাকেন।

কাওছারের অভিযোগ, তার এজাহারে দেয়া ৫ স্বাক্ষির কাউকেই তদন্তকালে জিজ্ঞাসাবাদ করেন নি মামুনুর। তিনি তার মনগড়া স্বাক্ষিদের কথা সাজিয়ে চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি চূড়ান্ত রিপোট্র্ দাখিল করেন।

এক্ষেত্রেও মারাত্মক অভিযোগ আছে কাওছারের। নিয়মানুযায়ী বাদির স্বাক্ষর না নিয়ে জাল স্বাক্ষর দিয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছেন। শুধু স্বাক্ষর জালই নয়, তিনি রিপোর্টে মেডিকেলে চিকিৎসা নেয়া, ১ নম্বর আসামি পারভেজের মায়ের কাছে পাওনা ১ লাখ ২৫ হাজার টাকার ব্যাপারে ১শ’ টাকার স্ট্যাম্পে করার নথির বিষয়ে কোন উল্লেখ করেন নি। মামলার আগে কাওছার তার ব্যক্তিগত অফিস চুরির বিষয়েও একটি জিডি করলেও সেই বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়নি।

এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পারভেজের দেয়া বিভিন্ন হুমকি ধমকির ব্যাপারে জিডি দায়ের করা হলেও মামুনুর রশীদ চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন নি। তাছাড়া মামুন কাওছারের পক্ষে চার্জশিট দিতে ৫০ হাজার টাকাও দাবি করেছিলেন। কাওছার জানান, মামুনুর রশীদের এতসব অনিয়মের বিরুদ্ধে এর আগে পুলিশ সুপার ও দুদকের সিলেট অফিসে অভিযোগ করেন। কাওছারের এই অভিযোগটি আমলে নিয়ে বিষয়টি তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন সিলেট অফিসকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
তবে গোলাপগঞ্জ মডেল থানার এসআই মামুনুর রশীদ এ প্রসঙ্গে বলেন, পিবিআই আমাকে ডাকে নি। অভিযোগতো একজন করতেই পারে। গত ১৭ এপ্রিল কাওছারকে কোনো নির্যাতন করেন নি বলে দাবি করেন তিনি।

তবে কাওছারের সাথে তার কথা হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন।
কাওছারের স্বজনদের অভিযোগ, এসআই মামুনের সাথে আবদুল আহাদের সু-সম্পর্ক রয়েছে। উপজেলায় বিভিন্ন সময়ে তাদের একসাথে ঘুরতে দেখা যায়। এছাড়া স্ট্যান্ড রিলিজ হওয়ার পরও এসআই মামুনুর রশীদ থানায় গেলেই তার আশেপাশে আহাদকে দেখা যায়। জালিয়াতি করে ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া মামলার নেপথ্য কারিগর আহাদ।

গোলাপগঞ্জ থানার ওসি হারুনুর রশীদ চৌধুরী বলেন, স্ট্যান্ড রিলিজ হওয়ার পর তাৎক্ষনিকভাবে এসআই মামুনুর রশীদ থানা থেকে সরে যান। তার কাছে তদন্তে থাকা মামলাগুলো নতুন তদন্ত কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করতে প্রায়ই থানায় আসেন।

এ ব্যাপারে আবদুল আহাদ নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এসআই মামুনুর রশীদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নাই। বাজারের ব্যবসায়ীদের ঝামেলা নিয়ে প্রায়ই থানায় যেতে হয় বলে দাবি করেন তিনি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


লাইক দিন
%d bloggers like this: