October 24, 2021, 1:42 pm

ভারতের শিলং-চেরাপুঞ্জি ভ্রমণ

নদী টিভি ডেস্ক:

প্রথমবার ২০১৯ সালের জুলাই মাসে তিনদিনের জন্য সিলেটের পাশে অবস্থিত ভারতের মেঘালয় রাজ্যের রাজধানী শিলং এ যাওয়ার সুযোগ হয়। এই ভ্রমণটি হঠাৎ করেই হয়েছিল। ২০১৮ সালে পাসপোর্ট তৈরি করার পর বন্ধু কবীরের পরামর্শে ভারতের এক বছর মেয়াদী একটি ভ্রমণ ভিসা নিয়ে রাখি। কিন্তু বিভিন্ন ব্যস্ততা ও পড়াশোনার কারণে আমার ভারতে যাওয়া হয়নি, এদিকে আমার ভিসার মেয়াদ প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে আসছিল। তাই আমার আরেক বন্ধু মুসাফির ট্র্যাভেলস এর মালিক মিসবাহ এর সাথে দেশের বাহিরে একটি ভ্রমণের জন্য কথা বলি। বন্ধু মিসবাহ আমাকে জানায় জুলাই এর প্রথম সপ্তাহে তার একটি ট্যুর প্যাকেজ আছে। আমি চাইলে তাদের সাথে শিলং ভ্রমণে যেতে পারি। আমিও রাজি হয়ে গেলাম। পরবর্তীতে সে সব কিছুর ব্যবস্থা করলো।

ভ্রমণ একটি শখের বিষয়। ছোটবেলা থেকেই ঘুরাঘুরি-ভ্রমণের প্রতি আমার দুর্বলতা রয়েছে। যার কারণে বাংলাদেশের অধিকাংশ জেলার দর্শনীয় স্থানগুলো ভ্রমণ করার সৌভাগ্য হয়েছে। এছাড়া প্রতিবেশী দেশ ভারতেও যাওয়া সুযোগ হয়েছে। জুলাই এর ৪ তারিখ বৃহস্পতিবার। সকালে আসলো সেই মাহেদ্রক্ষণ। সকাল ৭টায় আমরা চলে আসলাম সিলেটের রোজ ভিউ হোটেলের সামনে। এখানে আমাদের জন্য নির্ধারিত গাড়ী অপেক্ষা করছিল। সাড়ে ৭টার মধ্যেই সবাই চলে আসলো এবং তামাবিল বর্ডারের উদ্দেশ্যে আমাদের গাড়ী সিলেট ছাড়লো। তামাবিল পৌঁছার পর সকাল ১০টার মধ্যেই আমাদের সকল অফিসিয়াল কাজ শেষ হয়ে যায় এবং ডাউকি দিয়ে ভারতে প্রবেশ করি।

জাফলং বেড়াতে গেলে একটি ঝুলন্ত ব্রিজ আমরা দেখতে পাই। পিয়াইন নদীর উপর অবস্থিত এই ব্রিজের উপর দিয়ে মূলত শিলং যেতে হয়। ডাউকি সীমান্তে অবস্থিত এই ব্রিজটি বাংলাদেশের পর্যটকদের বেশ আকর্ষণ করে। জাফলং বেড়াতে গেলে এই ব্রিজটি যে কারও নজরে আসবে। ব্রিজের উপর যাওয়ার পর পিয়াইন নদীর পানি অনেকটা সবুজ দেখা যায়। ভারতে পর্যটকরা এই নদীতে নৌকা দিয়ে ভ্রমণ করতে আসেন। এখানে নৌকা দিয়ে ভ্রমণ করা অন্যরকম এক অনুভূতি কাজ করে। প্রকৃতিপ্রেমী যে কাউকেই পাহাড়ের বুক ছিরে প্রবাহিত এই নদীতে নৌকা ভ্রমণ আকর্ষিত করবে। আমরা বেশ কিছুক্ষণ এখানে ছবি তুললাম।

ডাউকি ব্রিজ পার হওয়ার পরই সীমান্ত দিয়ে আমাদের গাড়ী পাহাড়ের আঁকাবাঁকা, উঁচুনিচু রাস্তা দিয়ে চলতে শুরু করে। গাড়ী যতই পাহাড়ের উপর উঠছে ততই মনে হচ্ছে আমরা মেঘের কাছাকাছি চলে যাচ্ছি। কেমন যেন শীতল হাওয়া আমাদের ছুঁয়ে যাচ্ছে। রাস্তার দুইপাশে সারিসারি পাহাড়ি গাছ, মাথার উপর মেঘের ভেলা, শীতল বাতাস এবং ছোট বড় পাহাড় সব মিলে যেন এক স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এই সব দৃশ্য সরাসরি না দেখলে লেখে বুঝানো যাবে না।

ডাউকি থেকে আধা ঘন্টা গাড়ী চলার পর পাহাড়ের উপর আমাদের সকালের নাস্তা বিরতি দেওয়া হয়। মিসবাহ বাসা থেকে রান্না করে সবার জন্য সকালের নাস্তা নিয়ে এসেছিল। পাহাড়ের চূড়ায় মেঘের কাছাকাছি বসে সকালের নাস্তা করছি আমরা, এই অনুভূতি আসলে ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। নাস্তা শেষে আমাদের গাড়ী আবারও চলতে শুরু করে। এই ভ্রমণে আমরা ১১জন ছিলাম। আমরা তিনজন গাড়ীর ছাদের উপর বসে যাচ্ছি। একেকবার মনে হচ্ছিল মেঘ আমাদেরকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। হালকা কুয়াশার মত মেঘ (আব) আমাদের উপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে। শিশির বিন্দুগুলো আমাদের কাপড়ে পড়ছে। যতই সামনের দিকে যাচ্ছি ততই শীতল বাতাস অনুভব করছিলাম। এক সময় রাস্তায় একটি ব্রিজের উপরে আমাদের গাড়ী থামলো। আমরা সবাই গাড়ী থেকে নামলাম। এখানে প্রচুর মেঘ দেখা যাচ্ছে, মেঘের ঘনত্বের কারণে ব্রিজের বাইরে রাস্তা অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। আমরা সবাই মিলে তখন ছবি তোলায় ব্যস্ত। দুই মিনিটের মধ্যেই আবার সব আলোকিত হয়ে গেল, মেঘ সরে গেছে। এ যেন স্বপ্ন, মেঘের রাজ্যে ছিলাম আবার হঠাৎ করে পৃথিবীতে ফিরে এসেছি। আমাদের গাড়ী আবার চলতে শুরু করলো।

আমাদের প্রথম দিনের পরিকল্পনায় ছিল চেরাপুঞ্জি এবং তার পার্শ্ববর্তী দর্শনীয় স্থানগুলো দেখা। চেরাপুঞ্জির সুন্দর একটি স্থান হল মাওসমাই গুহা। এটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫০ মিটার। এই গুহাটি পার হতে একটি রোমাঞ্চকর পরিস্থিতি কাজ করে। গুহায় প্রবেশ না করলে এর এডভেঞ্চার বুঝতে পারবেন না। অনেকে মাঝ গুহা থেকে ফিরে আসে। কারণ মাঝখানে এক পর্যায়ে গুহাটি অনেক সরু, এই সরু দিক দিয়ে যেতে এক রকম ভয় কাজ করে। আমাদের সবাই গুহাটি পার হতে পারলো না। আমিসহ ৩/৪জন হবে গুহা অতিক্রম করেছিলাম।

চেরাপুঞ্জিতে আসার পথে ছোট বড় অনেক ধরণের ঝর্ণা দেখা যায়। পাহাড়ের বুক ছিরে পানি বের হচ্ছে, যা দেখে মন জুড়িয়ে যায়। তেমনি ‘সেভেন সিস্টার ফলস’ নামে একটি খুব সুন্দর এবং দর্শনীয় ঝর্ণা রয়েছে সেখানে। অনেকগুলো ঝর্ণা থেকে পাশাপাশি এবং এক সাথে পানি পড়ছে। এই দৃশ্য সত্যিই মনোমুগ্ধকর। এছাড়া কাছাকাছি জায়গা নোহকালিকাই নামে আরও একটি ঝর্ণা আছে। এটি ভারতের বৃহত্তম ঝর্ণাগুলোর অন্যতম। প্রায় ১১৭০ ফুট উপর থেকে পানি পড়ে।

এছাড়া আমরা চলতি পথে আরও দেখেছি ওয়াকাবা ফলস, ইকো পার্ক, বাংলাদেশ ভিউ এবং মাউকডক ভ্যালি। সীমান্তবর্তী একটি পাহাড় থেকে বাংলাদেশকে খুব সুন্দরভাবে দেখা যায়। তাই এটার নাম দিয়েছে বাংলাদেশ ভিউ। এই দশর্নীয় স্থানগুলো দেখতে দেখতেই সন্ধ্যা হয়ে আসে, তাই আমরা রওনা দেই শিলং শহরের উদ্দেশ্যে, যেখানে আগে থেকেই আমাদের জন্য হোটেল বুক করা ছিল রাতে হোটেলে এসে ফ্রেশ হয়ে আমরা কয়েকজন মিলে বিখ্যাত পুলিশ বাজার দেখার জন্য বের হই। পাহাড়ের উপর একটি শহর এত সুন্দর করে সাজানো, যা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করানো যাবে না। রাতের পুলিশ বাজার খুবই সুন্দর দেখায়।

পরদিন শুক্রবার সকালে আমরা বের হলাম শিলং শহরের দশর্নীয় স্থানগুলো দেখার জন্য। সকালেই হোটেলের সামনে আমাদের গাড়ী চলে আসলো। একে একে বিভিন্ন স্থান ঘুরে ঘুরে দেখানো হচ্ছিল, আর আমরা সেগুলো দেখে মুগ্ধ হচ্ছিলাম। এছাড়া স্থানীয়দের আচরণও অনেক মুগ্ধ করার মতো ছিল। এখানের উল্লেখযোগ্য জায়গাগুলোর মধ্যে ছিল লেডি হায়দারি পার্ক। যেখানে একটি ছোট চিড়িয়াখানা এবং জাদুঘর রয়েছে। পার্কটি এত সুন্দরভাবে ঘুছানো যা একজন পর্যটকের মন সহজেই জুড়িয়ে দিতে পারে। শহরের মধ্যেই রয়েছে একটি সুন্দর ঝর্ণা যা এলিফ্যান্ট ফলস নামে পরিচিত। সিঁড়ি দিয়ে এই ঝর্ণার উপর থেকে নিচে নামা যায়। এর মধ্যে রয়েছে অনেকগুলো ভিউ পয়েন্ট। এখানে খাসিয়া আদিবাসিদের পোশাক পরিধান করে ছবি তোলা যায়। শিলং শহরে রয়েছে দশর্নীয় একটি সুন্দর মসজিদ, যা মদিনা মসজিদ নামে পরিচিত। এছাড়া আমরা বিকেল বেলায় একটু সময় ওয়ার্ডস লেকেও কাটিয়েছি। শিলং শহরের রাস্তাগুলো এত পরিচ্ছন্ন এবং সুন্দর ছিল, যা দেখলে মনে হবে প্রতিদিন শহরটাকে পানি দিয়ে একবার ধৌত করা হয়।

শিলংয়ে ঘোরাঘুরি করলে শীতল-ঠান্ডা পরিবেশ সহজেই মন জুড়িয়ে যায়। সারাদিন ঘোরাঘুরি শেষে বিকেলবেলায় সবাইকে যে যার মত করে শপিং করার জন্য বলা হয়। সবাই ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে শপিং করে রাতে আবার হোটেলে ফিরে আসে। ওইদিন রাতে ৪জন মিলে আমাদের কক্ষে ছোট করে একটি পার্টির আয়োজন করেছিলাম। শনিবার ছিল আমাদের ফেরার পালা, সকালেই আমরা ব্যাগপত্র ঘুছিয়ে রওনা হয়ে যাই।

ডাউকির উদ্দেশ্যে আসার পথে এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম মাউলিনং দেখে আসি। একটি গ্রাম এত সুন্দর করে সাজানো থাকতে পারে তা এখানে না আসলে বুঝা যেত না। প্রতিটি বাড়ির সামনে রয়েছে ফুলের বাগান, ছোট ছোট কটেজে রাত্রী যাপন করার মত ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া আমরা ঘুরে দেখেছি লিভিং রুট ব্রিজ। এখানে একটি জীবন্ত গাছের মূলের নিচ দিয়ে বয়ে গেছে ছোট একটি নদী, আর এর একটু সামনে রয়েছে সুন্দর একটি ঝর্ণা বাংলাদেশের বিছানাকান্দি সীমান্তে পান্থুমাই নামে একটি ঝর্ণা দেখা যায়, এটি ভারতে বুরহিল নামে পরিচিত। আমরা আসার সময় সেই ঝর্ণাটিও দেখে এসেছি। এখানে একটি ছোট্ট ব্রিজ রয়েছে। ব্রিজের উপর দাঁড়ালে মনে হবে ঝর্ণার পানি শরীরে এসে পড়ছে।

আসলে শিলংয়ে সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হল ঝর্ণা। সবকিছু দেখা শেষে বিকেলের মধ্যেই আমরা ডাউকি-তামাবিল সীমান্ত দিয়ে সিলেটে চলে আসি। সিলেটের রাস্তার আসার পর মনে হল এত কম সময় শিলং দেখে আত্মতৃপ্তি আসেনি। আবার সময় করে যেতে হবে, বেশি সময় বের করে মেঘের রাজ্য মেঘালয় ঘুরে দেখতে হবে।

  • আরাফ আহমদ। শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


লাইক দিন
%d bloggers like this: