October 23, 2021, 3:04 pm

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হোক : প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মেহেদী হাসান খান

বর্তমান বাংলাদেশ সরকার শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য বদ্ধপরিকর এবং সে অনুযায়ী অগ্রসর হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে এই প্রচেষ্টার সবচেয়ে বড় অন্তরায় করোনা মহামারী। সারাবিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও করোনা ভাইরাসের প্রকোপে স্থবিরতা নেমে এসেছে। করোনাভাইরাসের প্রকোপ যেন ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য বর্তমান সরকার গতবছর সারাদেশে লকডাউন ঘোষণা করে, যা ছিল যুক্তিসঙ্গত ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। কিছুদিন পর জীবন জীবিকার তাগিদে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যতিত সীমিত পরিসরে আবার সবকিছু খুলে দেওয়া হয়। শিক্ষাব্যবস্থাকে গতিশীল রাখার জন্য সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করার নির্দেশনা দেয়। অনলাইনে ক্লাস চললেও ডিভাইস ও নিরবিচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা শতভাগ নিশ্চিত করতে না পারায় এই সেবা কার্যকরভাবে পৌঁছায়নি। যার ফলস্বরূপ সার্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থায় বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা এবং চিকিৎসা। এই ৫টি মৌলিক অধিকারের মধ্যে শিক্ষা একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকার। যে জাতি যত বেশী শিক্ষিত সে জাতি তত বেশী উন্নত। সেজন্যই হয়তো শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড বলা হয়। নেপোলিয়ন বলেছিলেন, “আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি একটি শিক্ষিত জাতি দিবো”।

সরকার সব শিক্ষার্থীদের ভ্যাক্সিন কার্যক্রমের আওতায় এনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলার ব্যাপারে ভাবছে যা যুক্তিসঙ্গত। সব শিক্ষার্থীদের একসাথে ভ্যাক্সিন কার্যক্রমের আওতায় আনা সম্ভব নয় সে ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করার একটি ধারা সৃষ্টি করা উচিত এবং পর্যায়ক্রমে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া উচিত। এতে শিক্ষার্থীরা যেমন মানসিক প্রশান্তি পাবে তেমনি স্থিমিতপ্রায় শিক্ষা ব্যবস্থায় সঞ্চার ঘটবে, সেই সাথে সারা বাংলাদেশের অভিভাবকদের উৎকন্ঠাও কিছুটা কমবে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীর জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি খেলাধুলা ও চলাফেরার মাধ্যমে মানসিক, শারীরিক এবং সামাজিক বিকাশ ঘটে। দীর্ঘ ১৪ মাস যাবৎ সবধরণের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের মানসিক, শারীরিক ও সামাজিক বিকাশে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। যার ফলে প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেইসাথে বাড়ছে বাল্যবিবাহের মত অপরাধ। সারাদিন ঘরবন্ধি থাকার ফলে শিক্ষার্থীরা ঝুঁকে পড়ছে বিভিন্ন ইন্টারনেটভিত্তিক ভিডিও গেমসে এবং বাড়ছে ইন্টারনেট আসক্তি, যার ক্ষতি ধীর হলেও প্রভাব অনেক সুদূরপ্রসারী।

ইউনিসেফের সাম্প্রতিক দেওয়া তথ্যমতে, দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র বাংলাদেশে লাগাতার ১ বছরের বেশি সময় ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে। যার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের উপর। বিশ্ববিদ্যালয় মানেই জ্ঞান সৃষ্টি, সংরক্ষণ ও প্রসার। অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করতে পারলেও প্র্যাক্টিক্যালি তা প্রয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না। সেই সাথে গবেষণার মাধ্যমে নতুন কোনো জ্ঞান সৃষ্টির সুযোগ থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকার কারণে তৈরী হয়েছে সেশনজট যা শিক্ষার্থীদের মনে তৈরী করেছে গভীর উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার। যেহেতু সরকারি চাকুরীতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০বছর, সেহেতু সঠিক সময়ে পাশ করে বের হতে না পেরে তাদের মধ্যে কাজ করছে চরম হতাশা। সেজন্য আপামর ছাত্রসমাজের পালস বুঝে সরকারি চাকুরীতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর দাবি গভীরভাবে বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবী।

করোনা মহামারী যে অনেকদিন পৃথিবীতে বিরাজ করবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর মতে করোনা একটি মৌসুমী রোগ হিসেবে অনেকদিন থাকার সম্ভাবনাই বেশী। তাহলে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কি বছরের পর বছর ধরে বন্ধ থাকবে? সরকার সব শিক্ষার্থীদের ভ্যাক্সিন কার্যক্রমের আওতায় এনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলার ব্যাপারে ভাবছে যা যুক্তিসঙ্গত। সব শিক্ষার্থীদের একসাথে ভ্যাক্সিন কার্যক্রমের আওতায় আনা সম্ভব নয় সে ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করার একটি ধারা সৃষ্টি করা উচিত এবং পর্যায়ক্রমে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া উচিত। এতে শিক্ষার্থীরা যেমন মানসিক প্রশান্তি পাবে তেমনি স্থিমিতপ্রায় শিক্ষা ব্যবস্থায় সঞ্চার ঘটবে, সেই সাথে সারা বাংলাদেশের অভিভাবকদের উৎকন্ঠাও কিছুটা কমবে।

তাই সামগ্রিক দিক বিবেচনা করে অতিসত্বর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ব্যাপারে নীতিগত সিন্ধান্ত নিয়ে তা দ্রুত বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হোক। ছুটি না বাড়িয়ে সীমিত পরিসরে হলেও বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হোক।

  • প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মেহেদী হাসান খান
    ডিন, বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদ,
    সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট-৩১০০।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


লাইক দিন
%d bloggers like this: