October 22, 2021, 4:00 pm

মিজান আল মিহাদ’র ছোটগল্প: টুপি

১.
সপ্তাহে একদিন টুপির বড়ো প্রয়োজন পরে।খুঁজতে খুঁজতে কোনদিন পাই তো কোনদিন পাই না।খালি মাথায় জানাজা পড়া যায় কিন্তু জুম্মা পড়া একেবারে যায় না।ছিঃ লোকে কি ভাববে! আমার একটা টুপিও নাই? অনেক খুঁজে শেষমেশ দুলাভাইয়ের ফেলে যাওয়া বছর খানেক আগের পরিত্যক্ত একটা টুপি মিলল।ইচ্ছে হলো দুলাভাইকে জড়িয়ে ধরে একটা চুমু দেই। তা’আর হল কই?কোথা থেকে বউ এসে হাজির।এই স্তব্ধ দুপুরে তার চুমু খাওয়ার শখ হলো ভেবে মনে মনে যারপরনাই খুশি হলাম।

চুমু দেবার প্রয়াসে যেই বউয়ের দিকে তাকালাম এমনি বউ চিৎকার করে বলল,
–এই নোংরা টুপি পরে তুমি নামাজে যাবা?ছিঃ তোমার দেখি যত বয়স হচ্ছে তত দোষ হচ্ছে। আমার কপালটাই খারাপ নাইলে এমন মানুষের সাথে আমি সংসার করি।এই নাও,এই টুপি পরে নামাজে যাও।

সত্যি বলতে বউয়ের কপাল ভালো না খারাপ তা নির্ণয়ের যথেষ্ট সময় আছে।এখন পলায়নই ভালো। যঃ পলায়েতে স জীবতি।বউয়ের হাত থেকে টুপিটা নিয়ে বলতে গেলে পালিয়ে বাঁচলাম।

২.
মসজিদে এসে দেখি সবাই বেশ আগ্রহ নিয়ে বসে আছে।সভাপতি সাহেব ঈষৎ হেসে বলছেন,আপনারা সবাই জানেন আমাদের মসজিদ এক কোটি টাকার বাজেট নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে।এখনো পর্যন্ত প্রায় ৫০ লাখ টাকার কাজ বাকী।বাকী কাজ পুরো না করলে বর্ষামাসে মসজিদে নামাজ পড়া যাবে না। আপনারা সবাই আল্লাহ রাস্তায় জান মাল দিয়ে সাহায্য করুন।

সবার আগে দাঁড়ালেন চৌধুরী সাহেব।একা তিনিই দিলেন পাঁচ লাখ, এরপর মাতব্বর চাচা এক লাখ,জহির ভাইয়ে পঞ্চাশ হাজার এভাবে চলল…আমারও মন চাইল পাঁচ হাজার টাকা আল্লাহ রাস্তায় দেই কিন্তু ইতিহাস স্বাক্ষী যতবার বউকে না বলে কিছু করেছি ততবার ঠকা খেয়েছি।বউটি আমার খুব বুদ্ধিমতী।যত ভালোভাবেই কাজটা করি না কেন সে ঠিকই খুঁত খুঁজে পাবে!ফলে আমার যাবতীয় দায় দায়িত্ব বউয়ের কাঁধে দিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই।লোকে বলে সুন্দরী মেয়েরা বোকা টাইপের হয় কিন্তু আমার বউ যেমন সুন্দরী তেমনি বুদ্ধিমতী।এমন বউ থাকায় হয়তো এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড এখনো টিকে আছি।বউয়ের নেক হায়াতের জন্য তাই মনে মনে কিছু টাকা মানলাম।পরে বউয়ের সাথে পরামর্শ করে ঠিক করা যাবে কত টাকা দেয়া যায়!

মসজিদের টাকা তুলা শেষে সভাপতি সাহেব অনেক রুষ্ট হয়ে আরেকটি তালিকা বের করলেন।ইমাম ও মুয়াজ্জিনের গত ছয় মাসের বেতন এখনো আটকে আছে।প্রতি সপ্তাহের মতো এবারও এই ঘোষণাটি দিয়ে সভাপতি আজকের মতো টাকা তোলার যবনিকাপাত ঘটালেন।

৩.
নামাজ শেষ করে বাইরে এসে দেখি আমার বন্ধু আসগর দাঁড়িয়ে। আমায় দেখেই ঠাট্টা করে বলল,তারাতাড়ি বাড়ি না ফিরলে বুঝি খবর আছে?
–তোরা বিয়ে কর। তাহলে বুঝবে বিবাহিত পুরুষের কষ্ট।
–অভিশাপ দিলে না তো?
–অভিশাপ লাগলে তো।
–হা হা। আচ্ছা শুন,আজকে মাঠে খেলা আছে। চৌধুরী সাবে পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে সভাপতির আসন কিনেছে।পারলে বউয়ের পারমিশন নিয়ে মাঠে আসিস।
– আচ্ছা আসব।

ঘরে ফিরে দেখি এক ভিক্ষুক মহিলা চেয়ারে বসে ভাত খাচ্ছে।নুসরাতকে ডেকে বললাম, এসব কি হচ্ছে?
–কি হচ্ছে মানে?একজন মানুষ সারাদিন কিছু খায় নি।তাই খেতে দিলাম।
– তাই বলে চেয়ারে?
–ও মা!তো কি মাটিতে বসে খাবে?
–আমি কই খাব?
–কেন? তোমার ভাত তো প্লেটে রাখা আছে। যাও, খাও গিয়ে।আমিও আসছি।

নুসরাতকে নিয়ে আর পারা গেল না।খিদেও পেয়েছে বেশ,ভিক্ষুকের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। অগত্যা ভিক্ষুকের সাথেই বসতে হল।মহিলাটি তখনো আমার আফগানি টুপির দিকে পলকহীন তাকিয়ে আছে যেমন জগতবাসী অবাক দৃষ্টিতে উর্ধ্বাকাশে তাকায়।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


লাইক দিন
%d bloggers like this: